ট্রাম্পের শুল্কনীতি

লিভারেজড ইটিএফ খাতে সবচেয়ে বড় লোকসান

লিভারেজড এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ডে (ইটিএফ) অন্য যেকোনো বিনিয়োগের তুলনায় মুনাফা ও লোকসানের ঝুঁকি বরাবরই বেশি থাকে। এ কারণে বিনিয়োগকারীদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়।

লিভারেজড এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ডে (ইটিএফ) অন্য যেকোনো বিনিয়োগের তুলনায় মুনাফা ও লোকসানের ঝুঁকি বরাবরই বেশি থাকে। এ কারণে বিনিয়োগকারীদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। তবে সাম্প্রতিক লোকসান ইতিহাসের যেকোনো সময়কে ছাড়িয়ে গেছে। কারণ আর কিছু নয়, ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত শুল্কনীতি আর্থিক বাজারের প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলেছে। গত সপ্তাহের শেষ দিকে লিভারেজড ইটিএফ বিনিয়োগকারীরা ২৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন বা ২ হাজার ৫৭০ কোটি ডলার হারিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ লোকসান উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ফান্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ধস। খবর এফটি।

কয়েক বছর ধরে খুচরা বিনিয়োগকারীরা বিকল্প লগ্নির উপায় খুঁজছেন। তাই তারা দ্রুত মুনাফার আশায় লিভারেজড ইটিএফে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে আসছেন।

লিভারেজড ইটিএফ হচ্ছে এমন ধরনের বিনিয়োগ ফান্ড, যা কোনো নির্দিষ্ট সূচক বা খাতের পারফরম্যান্সকে গুণিতক হারে প্রতিফলিত করে। যেমন যদি এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক কোনোদিন ১ শতাংশ বাড়ে, সেদিন ইটিএফ সূচক প্রায় ২ শতাংশ বাড়বে। এমনকি তা প্রতিদিনের শেয়ার বা সূচকের মুনাফাকে পাঁচ গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু ৩ ও ৪ এপ্রিল লিভারেজড ইটিএফ এক-চতুর্থাংশ মূল্য হারিয়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফ্যাক্টসেট জানিয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ এবং আর্থিক বাজারের ভাঙনের কারণে এ ধরনের বিনিয়োগ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

লিভারেজড ইটিএফ বাজারে বড় ধস নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে এবারের লোকসানটি পূর্ববর্তী রেকর্ডগুলোকে ছাড়িয়ে গেছে। এর আগে ২০২০ সালের মার্চে কভিড-১৯ সংকটকালে দুটি আলাদা দিনে লিভারেজড ইটিএফ বাজার যথাক্রমে ৯১০ কোটি ডলার ও ৫৬০ কোটি ডলার হারিয়েছিল। এরপর ২০১৮ সালে আরেকটি পতন দেখা যায়। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে একদিন হঠাৎ ভলাটিলিটি ইনডেস্ক বা ভিআইএক্স দ্বিগুণ বেড়ে যায়। ফলে অনেক শর্ট ভলাটিলিটি ইটিএফ বিপুল লোকসানের মুখে পড়ে। বিশেষ করে যেসব ইটিএফ বাজারে স্থিতিশীলতা ধরে রাখবে বলে আশা করা হয়েছিল সেগুলোয় ধস নামে। এ ঘটনা ইটিএফের ইতিহাসে ‘‌ভলমাগেডন’ নামে পরিচিতি।

৩ এপ্রিল থেকে গত সোমবার পর্যন্ত তিন কার্যদিবসে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারগুলোয় ব্যাপক পতন দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে ইউরোপ ও এশিয়ায় এ চিত্র দেখা যায়। কারণ পূর্বঘোষিত রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পারস্পরিক শুল্কের হিসাব-নিকাশ ২ এপ্রিল সামনে আনে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন নতুন আমদানি শুল্ক গতকাল কার্যকর হলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই ৯০ দিনের জন্য স্থগিত করা হয়। তবে ব্যতিক্রম কেবল চীনের ক্ষেত্রে। অন্য দেশগুলো রেহাই পেলেও চীনা পণ্যে শুল্ক বাড়িয়ে ১২৫ শতাংশ করা হয়েছে।

শুল্ক ঘোষণা উদযাপনের অংশ হিসেবে ২ এপ্রিলকে ‘লিবারেশন ডে’ হিসেবে ঘোষণা করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এদিন থেকে সব বাণিজ্য অংশীদারের ওপর ১০ শতাংশ রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ প্রযোজ্য হচ্ছে।

গত জানুয়ারি থেকে শুল্ক বিষয়ে দফায় দফায় সিদ্ধান্ত নিয়ে আসছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, যা খুচরা বিনিয়োগকারীদের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়ে। সর্বশেষ ধসের ঘটনাকে দ্রুত বিকাশমান খাতটির জন্য বড় সতর্কবার্তা বলে উল্লেখ করছেন বিশ্লেষকরা।

বৈশ্বিক আর্থিক খাতে লিভারেজড ইটিএফের যাত্রা ২০০৬ সালে, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ৬৫০টির বেশি এ ধাঁচের ফান্ড রয়েছে। এসব তহবিলের স্পর্শকাতরতা সম্পর্কে ফ্যাক্টসেটের গ্লোবাল ফান্ড অ্যানালিটিকস বিভাগের পরিচালক এলিজাবেথ ক্যাশনার বলেন, ‘অনেকটা ধারালো ছুরির মতো ইটিএফ বিনিয়োগ। এগুলো সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্য পরিকল্পিত। যারা এ খাতে বিনিয়োগ করেন, তাদের ঠিকভাবে জানতে হবে আসলে তারা কী করছেন।’

প্রতিবেদন অনুসারে, গত সপ্তাহে দুদিনে সবচেয়ে বড় লোকসানে থাকা ইটিএফ ছিল আয়ারল্যান্ডভিত্তিক লিভারেজড শেয়ারস ফোরএক্স সেমিকন্ডাক্টরস ইটিএফ, এর দর কমেছে ৫৯ দশমিক ১ শতাংশ। একই কোম্পানির অন্য তিনটি ইটিএফ পণ্য হলো ফাইভএক্স লং ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন, থ্রিএক্স বোয়িং ও থ্রিএক্স আর্ম। এসব ফান্ডের দর কমেছে ৫০ শতাংশের বেশি।

মার্কিন মুদ্রা ডলারে হিসাব করলে সবচেয়ে বেশি লোকসানের শিকার হয়েছে প্রোশেয়ারস আল্ট্রাপ্রো কিউকিউকিউ। ধসের আগে প্রযুক্তিনির্ভর ন্যাসডাক ইনডেক্সভিত্তিক এ ইটিএফের বাজারমূল্য ছিল ২ হাজার কোটি ডলার এবং যেখান থেকে হারিয়েছে ৬৩০ কোটি ডলার।

একসময় পুঁজিবাজারে বড় উল্লম্ফন দেখেছে প্রযুক্তিভিত্তিক কোম্পানিগুলো। কিন্তু চলতি বছরের শুরু থেকে প্রযুক্তিভিত্তিক সূচক নিম্নমুখী রয়েছে। বিষয়টির প্রভাব ইটিএফের বাজারেও দেখা যাচ্ছে। ফ্যাক্টসেটের এলিজাবেথ ক্যাশনারের মতে, লিভারেজড ইটিএফ খাতে লোকসানের পুরো বিষয়টি ঘুরে-ফিরে সেমিকন্ডাক্টর ও প্রযুক্তি শিল্পের চারপাশে প্রভাব ফেলছে। এর মধ্যে অনেক ইটিএফ বড় অংকের অর্থ হারিয়েছে।

বিশ্বে সবচেয়ে বড় লিভারেজড ইটিএফের বাজার যুক্তরাষ্ট্রে। তবে সেখানে লিভারেজ সর্বোচ্চ তিন গুণ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকায় লোকসানের মাত্রাও কিছুটা নিয়ন্ত্রিত থাকে। সাম্প্রতিক ধসে যেখানে প্রত্যাশিত আচরণই দেখা গেছে।

বিনিয়োগবিষয়ক পরামর্শক সংস্থা মনিংস্টারের গবেষণা বিভাগে প্রধান কেনেথ লামন্ট বলেন, ‘‌সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এ ধরনের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য থেকে তীব্র ক্ষতির শিকার হতে পারেন। কারণ তাদের হাতে বড় প্রতিষ্ঠানের মতো ঝুঁকি সামাল দেয়ার সুযোগ থাকে না। তাই মুনাফার জন্য তিন গুণ বেশি ঝুঁকি নিতে হয় এমন বিনিয়োগ খুচরা পর্যায়ে সবচেয়ে ভালো বিকল্প নয়।’

আরও